ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশী
যারা প্রাণ দিয়েছে
ওখানে-রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য-বাংলার
জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে
ওখানে
একটি দেশের মহান
সংস্কৃতির মর্য্যাদার জন্য
আলাওলের ঐতিহ্য
কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য-
যারা প্রাণ দিয়েছে
ওখানে
পলাশপুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য-
রমেশ শীলের গাঁথার জন্য
জসীম উদদীনের 'সোজন বাদীয়ার ঘাটের' জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটীয়ালি, বাউল, কীর্ত্তন, গজল
নজরুলের 'খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।'
এদুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য,
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা
পাপড়ির মতো
চল্লিশটী তাজা প্রাণ, আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার
মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের
অসংখ্য বুকের রক্ত।
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি
বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে
সেরা কোন ছেলের বুকের রক্ত।
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের প্রতিটী রক্ত কণা
রমনার সবুজ ঘাসের উপর
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর জ্বলছে।
এক একটি হীরের টুকরোর
মতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা
চল্লিশটী রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো
পাকিস্তানের সবচেয়ে
মূল্যবান সম্পদ
যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার,
আরাগঁ, আইন-ষ্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয়
পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার
সবচেয়ে প্রগতিশীল
কয়েকটী মতবাদ,
সেই চল্লিশটী রত্ন
যেখানে প্রাণ দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে
আসিনি।
যারা গুলি ভরতি রাইফেল
নিয়ে এসেছিল ওখানে
যারা এসেছিল নির্দ্দয়
ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে
আমরা তাদের কাছে
ভাষার জন্য আবেদন
জানাতেও আসিনি আজ।
আমরা এসেছি খুনী
জালিমের ফাঁসীর দাবী নিয়ে।
আমরা জানি তাদের হত্যা
করা হয়েছে
নির্দয় ভাবে তাদের গুলি
করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমাদেরই
মতো ‘‘ওসমান”
কারো বাবা তোমারই বাবার
মতো
হয়তো কেরানী, কিম্বা পূর্ব বাংলার
নিভৃত কোন গাঁয়ে কারো
বাবা
মাটির বুক থেকে সোনা
ফলায়
হয়তো কারো বাবা কোন
সরকারী চাকুরে।
তোমরাই আমারই মতো,
যারা হয়তো আজকে বেঁচে
থাকতে পারতো
আমারই মতো তাদের কোন
একজনের
হয়তো বিয়ের দিন ধার্য
হয়েছিল
তোমারই মতো তাদের কোন
একজন হয়তো
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত
চিঠিখানা এসে পড়বার আশায়
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ
দিতে গিয়েছির
এমন এক একটি মূর্তিমান
স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলিতে যারা
প্রাণ দিল
সেই সব মুতদের নামে
আমি ফাঁসির দাবী করছি,
যারা আমার মাতৃভাষাকে
নির্বাসন দিতে
চেয়েছে তাদের জন্য
আমি ফাঁসি দাবী করছি,
যাদের আদেশে এই
দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্য,
ফাঁসি দাবী করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর
দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহন
করছে
সেই বিশ্বাস ঘাতকদের
জন্য।
আমি ওদের বিচার দেখতে
চাই।
খোলা ময়দানে সেই
নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের
গুলীবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে
চায়।
পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
এই চল্লিশটি রত্ন
দেশের চল্লিশজন সেরা
ছেলে
মা, বাব, বৌ আর ছেলে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক
একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল।
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ
করার
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক
শক্তিকে
কিভাবে মানুষের কাজে
লাগারো যায়,
শান্তিকে কাজে লাগানো
যায়,
তার সাধনা করার,
যাদের স্বপ্ন
ছিল-রবীন্দ্রনাথের
‘‘বাঁশীওয়ালার” চেয়েও সন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা
আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ
দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের
রক্তাক্ত চিহ্ন
মুছেদিতে পাবে না
সভ্যতার কোন পদক্ষেপ।
যদিও অসংখ্য মিছিল অস্পষ্ট
নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ করবে একদিন
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের
সেই ঘন্টা ধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের
ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষনা করবে,
যদিও আগামীতে কোন
ঝড়ঝঞ্ঝা বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে
দিতে পারে
তবুও তোমাদের শহীদ
নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।
খুনী জালিমের
নিপীড়নকারীর কঠিন হাত
কোনদিনও চেপে দিতে
পারবে না
তোমাদের সেই লক্ষ্য
দিনের আশাকে
যেদিন আমরা লড়াই করে
জিতে নেব
ন্যায় নীতির দিন
হে আমার মৃত ভায়েরা,
সেই নিস্তব্ধতার মধ্য
থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ
চীৎকার
ভেসে আসবে।
সেই দিন আমাদের দেশের
জনতা
খুনী জালিমের ফাঁসির
কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নি
শিখার মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের
আনন্দে।